অনির্বান – ১ লিরিক্স | নচিকেতা চক্রবর্তী

জীবনমুখী বাংলা গানের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তীর একটি অত্যন্ত জনপ্রিয়, আবেগঘন এবং সামাজিক-রাজনৈতিক সচেতনতামূলক গান হলো ‘যা অনির্বাণ’। গানটির শুরুতে থাকা মর্মস্পর্শী কথিকা বা মনোলোগ এবং পরবর্তীতে আদর্শচ্যুতির গ্লানিমা মাখা সুর শ্রোতাদের মনের গভীর এক অপরাধবোধ ও নস্টালজিয়া জাগিয়ে তোলে। নব্বইয়ের দশকের ছাত্ররাজনীতি, সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন এবং বাস্তবতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সেই স্বপ্ন হারিয়ে ফেলার এক নির্মম দলিল এই সৃষ্টি।

গানের মূল তথ্য

| গানের নাম | যা অনির্বাণ (দেখে যা যা অনির্বাণ) |

| গীতিকার ও সুরকার | নচিকেতা চক্রবর্তী |

| কণ্ঠশিল্পী | নচিকেতা চক্রবর্তী |

| গানের ধরন | জীবনমুখী গান / রাজনৈতিক ও সামাজিক বিচ্ছেদ |

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

নচিকেতা চক্রবর্তী তাঁর তীক্ষ্ণ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তবমুখী লেখনীর জন্য সুপরিচিত। ‘যা অনির্বাণ’ গানটি কেবল একটি সাধারণ গান নয়, এটি একটি রূপক গল্প। গানের প্রেক্ষাপটটি গড়ে উঠেছে দুই বন্ধুর পুনর্মিলনকে কেন্দ্র করে। কলেজের দিনগুলোতে যারা একসঙ্গে সমাজ পরিবর্তনের, শ্রমিক-কৃষকের মুক্তির এবং শ্রেণীহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখত, সময়ের ব্যবধানে তাদের একজন জাগতিক খ্যাতি ও সফলতার মোহে পড়ে বিখ্যাত হয়ে যান। অন্যদিকে ‘অনির্বাণ’ নামের বন্ধুটি সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে আজও মানুষের কল্যাণে মাঠ-ঘাটে কাজ করে যাচ্ছেন।

হাইওয়ের এক জনমানবহীন চায়ের দোকানে গোধূলির আলো-আঁধারিতে বহু বছর পর এই দুই বন্ধুর আকস্মিক দেখা হয়। অনির্বাণের সরল প্রশ্ন “সুখেই আছিস কি বল!” গায়কের মনে এক তীব্র আত্মগ্লানি ও অপরাধবোধের জন্ম দেয়। এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এবং যৌবনের হারিয়ে যাওয়া আদর্শকে স্মরণ করেই নচিকেতা এই অসাধারণ গানটি ও তার শুরুর বিখ্যাত অবতরনিকাটি রচনা করেছেন।

গানের সম্পূর্ণ পাঠ

যা অনির্বাণ সম্পূর্ণ গান

অনির্বাণ আমার বন্ধু, অনির্বাণের সাথে যখন আমার দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল তখন সময়টা ছিল বড় অদ্ভুত। আমরা হাইওয়ের ওপর দিয়ে অনেক দূরে একটা অনুষ্ঠান করতে যাচ্ছি, লাল আকাশ, সন্ধ্যে হয়ে আসছে, দু’পাশে ফাঁকা মাঠ। আমরা চা খাব বলে গাড়িটা দাঁড় করিয়েছি একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো চায়ের দোকানে। এমন সময় দেখতে পেলাম লাল আকাশকে পেছনে রেখে একটা ছেলে মাঠ পার হয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল– চিনতে পারছিস? আমি বললাম– না! বলল– ভালো করে দেখ। আমি সেই চুরি যাওয়া আলোতে ওকে চিনলাম, আমার বন্ধু অনির্বাণ।

আমার চোখের সামনে পুরোনো দিনগুলো ছায়ারূপের মতো ভেসে উঠছে। আমি ওকে প্রশ্ন করলাম– অনির্বাণ, তুই এখানে!! ও বলল– তাই তো কথা ছিল বন্ধু, আমাদের তো এখানেই থাকার কথা ছিল। আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। আমি খুব বোকার মতো ওকে প্রশ্ন করলাম– অনির্বাণ কি করছিস এখন? ও বলল– যা কথা ছিল বন্ধু, মানুষের মাঝখানেই আছি। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না, একটা অপরাধবোধ আমাকে গ্রাস করছে। ও বলল– তোর দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি গাড়িতে যেয়ে বসলাম। ও জানলার কাছে এসে বলল– এখন তো তোর নাম হয়ে গেছে, তুই তো বিখ্যাত হয়ে গেছিস! সুখেই আছিস কি বল! আমার গাড়ি স্টার্ট নিয়ে নিয়েছে, অনির্বাণ আমার জীবন থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে….. অনির্বাণের শেষ কথাগুলো আজও আমার কানে আলপিনের মতো বেঁধে— সুখেই আছিস…. সুখেই আছিস……….

দেখে যা, যা অনির্বাণ

কী সুখে রয়েছে প্রাণ

কী সুখে রয়েছি আমি

কী সুখে বেচেছি গান।

সেদিনের মিটিংয়ের মাইক

সেদিনের কলেজের স্ট্রাইক

সেদিনের মাতাল পদক্ষেপ

বে-দিক সিদ্ধান্তের আক্ষেপ

আজ কেঁদে এই মাপা পদচারণ

সেদিনের তালের কাছে ম্লান।

দেখে যা, যা অনির্বাণ

কী সুখে রয়েছে প্রাণ

কী সুখে রয়েছি আমি

কী সুখে বেচেছি গান।

শ্রমিকের মুক্তির গান

কৃষকের হাতিয়ার শান

শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্ন

ঘৃণার প্রতিপালনেতে যত্ন

আজ তোর ঘামে ভেজে যে পথের ধুলো

হয়তো সেথায় আমার হতো স্থান।

দেখে যা, যা অনির্বাণ

কী সুখে রয়েছে প্রাণ

কী সুখে রয়েছি আমি

কী সুখে বেচেছি গান।

Ja Anirban Romanized Version

Anirban amar bondhu, Anirbaner sathe jakhon amar ditiyobar dekha hoyechilo takhon somoyta chilo boro odbhut. Amra highway-er upor diye onek dure ekta onusthan korte jacchi, lal akash, sondhe hoye acche, du-pashe phaka math. Amra cha khabo bole garita dariyechi ekta bicchinno dwiper moto chayer dokane. Emon somoy dekhte pelam lal akashke pechone rekhe ekta chele math par hoye amar dike egiye acche. Amar samne eshe dariye bollo– chinte parchis? Ami bollam– na! Bollo– bhalo kore dekh. Ami shei churi jawa alote oke chinlam, amar bondhu Anirban.

Amar chokher samne purono dingulo chayaruper moto bhese uthche. Ami oke proshno korlam– Anirban, tui ekhane!! O bollo– tai to kotha chilo bondhu, amader to ekhaney thakar kotha chilo. Amar payer nich theke mati sore jacche. Ami khub bokar moto oke proshno korlam– Anirban ki korchis ekhon? O bollo– ja kotha chilo bondhu, manusher majhkhaney achi. Ami ar dariye thakte parchina, ekta oporadhbodh amake gras korche. O bollo– tor deri hoye jacche. Ami garite jeye boslam. O janlar kache eshe bollo– ekhon to tor nam hoye geche, tui to bikhoto hoye gechis! Sukhei achis ki bol! Amar gari start niye niyeche, Anirban amar jibon theke miliye jacche….. Anirbaner shesh kothagulo aajo amar kane alpin-er moto bedhe— Sukhei achis…. Sukhei achis……….

Dekhe ja, ja Anirban

Ki sukhe royeche pran

Ki sukhe royechi ami

Ki sukhe bechechi gan.

Sediner meeting-er mic

Sediner college-er strike

Sediner matal podokkhep

Be-dik siddhanter akkhep

Aj kende ei mapa podocaron

Sediner taler kache mlan.

Dekhe ja, ja Anirban

Ki sukhe royeche pran

Ki sukhe royechi ami

Ki sukhe bechechi gan.

Shromiker muktir gan

Krishoker hatiyar shan

Shrenihin shomajer shopno

Ghrinar protipalonete jotno

Aj tor ghame bheje je pother dhulo

Hoyto sethay amar hoto sthan.

Dekhe ja, ja Anirban

Ki sukhe royeche pran

Ki sukhe royechi ami

Ki sukhe bechechi gan.

গানের মূল ভাব ও চরণ বিশ্লেষণ

গানটির মূল সুর বা থিম হলো যৌবনের হারিয়ে যাওয়া আদর্শের প্রতি এক গভীর হাহাকার এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাছে আত্মসমর্পণ করার গ্লানি। তরুণ বয়সের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লবের স্বপ্ন কীভাবে সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে যায়, তা এখানে মূর্ত হয়েছে। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও খ্যাতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরম একাকীত্ব ও আত্মপ্রবঞ্চনার কথা নচিকেতা এখানে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে স্বীকার করেছেন।

গানটির শব্দশৈলী ও ছন্দ অত্যন্ত ধারালো এবং ক্ষুরধার। ‘কলেজের স্ট্রাইক’, ‘মিটিংয়ের মাইক’ কিংবা ‘শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্ন’-এর মতো রাজনৈতিক শব্দবন্ধগুলো নব্বইয়ের দশকের বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির আবহাওয়াকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে। নচিকেতার স্বভাবসুলভ ব্যঙ্গাত্মক ও তীক্ষ্ণ সুরের কারণে গানটি কোনো সাধারণ মেলোডি নয়, বরং এক জ্বলন্ত সামাজিক প্রশ্ন হিসেবে শ্রোতার সামনে হাজির হয়। গানের শেষ কথা ‘কী সুখে বেচেছি গান’ শব্দটির দ্বিমুখী অর্থ (গান গেয়ে বেঁচে থাকা বনাম গানকে বিক্রি করে দেওয়া) এর গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

এই গানটির প্রধান বিশেষত্ব হলো এর নাটকীয় উপস্থাপনশৈলী। গানের শুরুতে যে দীর্ঘ সংলাপটি রয়েছে, তা শ্রোতাকে একটি সিনেমার মতো দৃশ্যপটের মুখোমুখি দাঁড় করায়। জীবনের ইঁদুরদৌড়ে যারা নিজেদের পুরোনো আদর্শকে হারিয়ে ফেলেছেন, এই গানটি তাদের প্রত্যেকের অন্তরে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে। অনির্বাণের ঘামে ভেজা পথের ধুলো আর গায়কের ‘মাপা পদচারণ’-এর বৈপরীত্য গানটিকে বাংলা জীবনমুখী সংগীতের ইতিহাসে এক মাস্টারপিস হিসেবে অমর করে রেখেছে।

উৎস (Sources)

এই নিবন্ধের লিরিক্স, কথিকা এবং নচিকেতা চক্রবর্তীর সাঙ্গীতিক ক্যারিয়ার সংক্রান্ত তথ্যসমূহ তাঁর অফিশিয়াল অ্যালবাম ডিসকোগ্রাফি, নব্বইয়ের দশকের জীবনমুখী গানের অডিও আর্কাইভ এবং বিভিন্ন সময় দেওয়া শিল্পীর প্রামাণ্য সাক্ষাৎকার থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।