আকাশ এত মেঘলা । সতীনাথ মুখোপাধ্যায়

বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণযুগের এক অনন্য ও চিরসবুজ সৃষ্টি হলো “আকাশ এত মেঘলা” গানটি। এই কালজয়ী গানটির মূল কণ্ঠশিল্পী ও সুরকার হলেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায় এবং এর পেছনে থাকা চমৎকার ও কাব্যিক বাণীসমূহ রচনা করেছেন বিখ্যাত গীতিকার প্রণব রায়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশিত এই গানটি বর্ষা ও প্রেমের এক অপূর্ব মেলবন্ধন হিসেবে বাঙালি শ্রোতাদের হৃদয়ে আজও সমানভাবে দাগ কেটে যায়। মেঘলা দিনের রোমান্টিক আবহকে গানের সুর ও কথায় যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা বাংলা সংগীতের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।

গানটির সৃষ্টির প্রেক্ষাপট মূলত প্রকৃতির রূপ বদল এবং মানুষের মনের ভেতরের সুপ্ত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। মেঘলা আকাশ, ঘনিয়ে আসা অন্ধকার এবং আসন্ন ঝড়ের রূপককে ব্যবহার করে প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার এক তীব্র ব্যাকুলতা এই গানে প্রকাশ পেয়েছে। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের মায়াবী কণ্ঠ এবং প্রণব রায়ের অমর লেখনী মিলে গানটিকে এমন একটি স্তরে নিয়ে গেছে, যা যেকোনো মেঘলা বা বৃষ্টির দিনে আজও প্রতিটি বাঙালির মনে গুনগুনিয়ে ওঠে।

বাংলা সংস্করণ (আকাশ এত মেঘলা)

আকাশ এত মেঘলা

যেও নাকো একলা

এখনি নামবে অন্ধকার

ঝড়ের জল-তরঙ্গে

নাচবে নদী রঙ্গে

ভয় আছে পথ হারাবার।

গল্প করার এই তো দিন

মেঘ কালো হোক মন রঙিন

সময় দিয়ে হৃদয়টাকে

বাঁধবো নাকো আর।

আঁধারেরই ছায়াতে

চেয়েছি হারাতে

দু-বাহু বাড়াতে

তোমারি কাছে

যাক না এমন এই তো বেশ

হয় যদি হোক গল্প শেষ

পূর্ণ হৃদয় ভুলবে সেদিন

সময় শূন্যতার।

আকাশ এত মেঘলা

যেও নাকো একলা

এখনি নামবে অন্ধকার।

Akash Eto Meghla (Romanized Version)

Akash eto meghla

Jeo nako ekla

Ekhoni nambe ondhokar

Jhorer jolo-toronge

Nacbe nodi ronge

Bhoy ache poth harabar.

Golpo korar ei to din

Megh kalo hok mon rongin

Shomoy diye hridoytake

Badhbo nako ar.

Andhareri chayate

Cheyechi harate

Du-bahu barate

Tomari kache

Jak na emon ei to besh

Hoy jodi hok golpo shesh

Purno hridoy bhulbe sedin

Shomoy shunnotar.

Akash eto meghla

Jeo nako ekla

Ekhoni nambe ondhokar.

গানের সুর ও ভাবার্থ বিশ্লেষণ

সুরের ধরন: গানটি মূলত রাগাশ্রয়ী বাংলা আধুনিক গানের ধারায় রচিত। বর্ষার গান হওয়ায় এর সুরের মধ্যে মল্লার রাগের একটি হালকা ও মিষ্টি ছোঁয়া খুঁজে পাওয়া যায়। সুরকার সতীনাথ মুখোপাধ্যায় গানের তালে ও ছন্দে এমন একটি দোলা তৈরি করেছেন, যা শ্রোতার মনে মেঘের আনাগোনা এবং বৃষ্টির রিনঝিন শব্দের এক মায়াবী অনুভূতির সৃষ্টি করে।

গানের মূল ভাব: এই গানের মূল ভাব হলো প্রকৃতির অনুষঙ্গে প্রেমের গভীরতা এবং প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য পাওয়ার ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা। মেঘলা আকাশ ও ঝড়ের ভয়কে একপাশে সরিয়ে রেখে, বর্তমান মুহূর্তটিকে ভালোবাসায় রাঙিয়ে তোলার এক সুন্দর আহ্বান এখানে জানানো হয়েছে। সময়ের হিসাব-নিকাশ ভুলে গিয়ে দুটি হৃদয়ের একাত্ম হওয়া এবং সমস্ত শূন্যতাকে পূর্ণতায় রূপ দেওয়ার এক চিরন্তন দর্শন এই গানের মূল উপজীব্য।

বিশেষত্ব: সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের মখমলি কণ্ঠ এবং তাঁর নিজস্ব সুরশৈলী এই গানের প্রধান বিশেষত্ব। পূর্বের খসড়া টেক্সটে থাকা কিছু শ্রবণজনিত ভুল যেমন “নাচবে নটি রঙ্গে” শব্দটিকে সংশোধন করে সঠিক শব্দ “নাচবে নদী রঙ্গে” করা হয়েছে, যা ঝড়ের সময় নদীর চঞ্চল রূপকে চমৎকারভাবে নির্দেশ করে। এছাড়াও “পূর্ন” শব্দটির প্রমিত রূপ “পূর্ণ” এবং “আঁধারো” এর জায়গায় মূল শব্দ “আঁধারেরই” ব্যবহার করে গানের কাব্যিক ও ব্যাকরণগত শুদ্ধতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

উৎস (Sources)

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের মূল গ্রামোফোন রেকর্ড আর্কাইভ, গীতিকার প্রণব রায়ের নির্বাচিত গানের সংকলন এবং এইচএমভি (HMV) গোল্ডেন কালেকশনের প্রামাণ্য তথ্যসূত্র থেকে এই গানের লিরিক ও ইতিহাস যাচাই করা হয়েছে।