বাংলা গানের স্বর্ণযুগে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ যেন ছিল এক মায়াবী পরশপাথর। তাঁর গম্ভীর অথচ কোমল স্বরে গাওয়া ‘আকাশ মাটি ঐ ঘুমাল’ গানটি এক অপূর্ব আবেশ তৈরি করে। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের হৃদয়স্পর্শী কথা এবং অনুপম ঘটকের সুরের জাদুতে গানটি মানুষের মনের গহীনে জমে থাকা বিরহ ও অতৃপ্তির এক আখ্যান হয়ে উঠেছে। রাতের নিস্তব্ধতায় যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে, ঠিক তখনই হৃদয়ের কোণে যে সুর বেজে ওঠে, তা এই গানে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
গানের তথ্য
| গানের নাম | আকাশ মাটি ঐ ঘুমাল |
| কণ্ঠশিল্পী | হেমন্ত মুখোপাধ্যায় |
| গীতিকার | গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার |
| সুরকার | অনুপম ঘটক |
| গানের ধরন | আধুনিক বাংলা গান |
শিল্পী ও প্রেক্ষাপট পরিচিতি
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় মানেই এক ধ্রুপদী আভিজাত্য। সুরকার অনুপম ঘটকের সুরে হেমন্তবাবুর গায়কী সবসময়ই শ্রোতাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যেত। এই গানটিতে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের শব্দচয়ন অত্যন্ত কাব্যিক—তিনি প্রকৃতির ঘুমের সাথে মানুষের হৃদয়ের অস্থিরতাকে এক অপূর্ব বৈপরীত্যে দাঁড় করিয়েছেন। হেমন্তবাবুর কণ্ঠের ভরাট ও মরমী আবেদন গানটিকে এমন এক স্তরে উন্নীত করেছে, যা আজও পুরোনো দিনের বাংলা গানের ভক্তদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
আকাশ মাটি ঐ ঘুমাল
আকাশ মাটি ঐ ঘুমাল
ঘুমায় রাতের তারা।
তবে কিসের ধ্বনি মোর মরমে
হঠাৎ জাগায় সাড়া।।
ঝিরি ঝিরি বাতাস এলো ঝরা পাতার বনে
স্রোতের মতন স্বপ্ন এলে মনে
হৃদয় আমার কেই বা জানে ওগো
বল আমি ছাড়া।
ওগো আমার স্বপন দোসর বল কি চাও
ছায়ার মত ছুঁয়ে আমায় ব্যথা কেন পাও
ভরা পালে তরী কিগো বল
হবে স্রোতে হারা।।
জ্বল জ্বল তারার প্রদীপ ঐতো নিভে আসে
আর জলে ভরা নয়ন আমার হাসে
এত পেয়েও মাঝপথে কেন
হারায় তবু ধারা।
Akash Mati Oi Ghumal Romanized Version
Akash mati oi ghumalo
Ghumay rater tara.
Tobe kisher dhoni mor morome
Hothat jagay shara.
Jhiri jhiri batash elo jhora patar bone
Sroter moton shopno ele mone
Hridoy amar kei ba jane ogo
Bolo ami chhara.
Ogo amar shopon doshor bolo ki chao
Chhayar moto chhue amay byatha keno pao
Bhora pale tori kigo bolo
Hobe srote hara.
Jwol jwol tarar prodip oito nibhe ashe
Ar jole bhora noyon amar hashe
Eto peyeo majhpothe keno
Haray tobu dhara.
গানের মূল ভাব ও চরণ বিশ্লেষণ
গানটির মূল সুর হলো—‘অন্তর্মুখী বিরহ’। যখন পুরো পৃথিবী ঘুমের অতলে তলিয়ে যায়, তখন কবির মনে এক অজানা অস্থিরতা জেগে ওঠে। ‘আকাশ মাটি ঐ ঘুমাল, ঘুমায় রাতের তারা’—এই চরণের মাধ্যমে কবির একাকীত্ব ও জগতের নিস্তব্ধতাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‘ঝিরি ঝিরি বাতাস’ এবং ‘স্রোতের মতন স্বপ্ন’—প্রকৃতির এই রূপকগুলো কবির মনের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
গানটির শেষ অংশে ‘এত পেয়েও মাঝপথে কেন হারায় তবু ধারা’—এই লাইনটি এক গভীর দার্শনিক আক্ষেপ প্রকাশ করে। প্রাপ্তির মাঝেও কেন যেন এক অতৃপ্তি থেকে যায়, কেন মাঝপথে সব হারিয়ে যায়—এই চিরন্তন প্রশ্নটিই গানের মূল প্রাণ। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের দরাজ কণ্ঠে এই আক্ষেপ এক অন্যরকম আভিজাত্য পায়, যা গানটিকে কেবল একটি বিচ্ছেদ-গাথা নয়, বরং জীবনের এক জটিল সমীকরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
উৎস (Sources)
এই নিবন্ধের লিরিক্স এবং সাঙ্গীতিক তথ্যসমূহ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ডিসকোগ্রাফি, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের নির্বাচিত গীতিসংকলন এবং বাংলা আধুনিক গানের প্রামাণ্য ডিজিটাল আর্কাইভ থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।