বাংলা গানের ইতিহাসে মাকে নিয়ে রচিত অজস্র কালজয়ী গানের মধ্যে “আমি হারিয়েছি মোর ছোট্টবেলা” একটি অনন্য ও আবেগঘন সৃষ্টি। গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরকার সুপর্ণকান্তি ঘোষ এবং কণ্ঠশিল্পী মান্না দে—এই কিংবদন্তি ত্রয়ীর মেলবন্ধনে তৈরি এই গানটি মাতৃত্বের এক চিরন্তন ও সর্বব্যাপী রূপকে তুলে ধরে। শৈশব হারিয়ে গেলেও মায়ের স্মৃতি, তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং স্নেহ কীভাবে একজন মানুষের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি সংকটে এবং প্রতিটি সুখে-দুঃখে ছায়ার মতো জড়িয়ে থাকে, তা-ই এই গানের মূল সুর।
Table of Contents
গানের তথ্য
| শিরোনাম | তথ্য |
| গানের নাম | আমি হারিয়েছি মোর ছোট্টবেলা |
| কণ্ঠশিল্পী | মান্না দে |
| গীতিকার | পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় |
| সুরকার | সুপর্ণকান্তি ঘোষ |
| গানের ধরন | আধুনিক বাংলা গান / সিনেমার গান (মাতৃভক্তি ও মেলোডি) |
| মূল উপজীব্য | মায়ের সর্বব্যাপী উপস্থিতি, নিঃস্বার্থ স্নেহ এবং জীবনের পরম আশ্রয় |
আমি হারিয়েছি মোর ছোট্টবেলা
আমি হারিয়েছি মোর ছোট্টবেলা হারাইনি তোমাকে
আজো আমায় ঘিরে মা যে আমার সব খানেতেই থাকে ।
যখন দেখি কারো ঘরে ছোট্ট খুকু হাসে
মিষ্টি মায়ের মুখটি আমার চোখের উপর ভাসে ।
ইচ্ছে করে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরি তাকে
আদর করি আবার আমি আমার সোনা মাকে ।
মাথায় সিঁদুর কপালে টিপ চুলটি এলো করে
দেখি যখন কোন মেয়ে যায়গো পূজার ঘরে,
শুনি যখন সেই সে বধূ ফু দিয়ে যায় শাঁখে
চোখের উপর দেখি আমি লক্ষ্মী আমার মাকে।
বেহুস হয়ে একলা যখন থাকি জ্বরের ঘোরে
কপালে জল পটি দেয় যায় গো বাতাস করে,
আমার মাথায় যখন কোমল সে হাত পরশটি তার রাখে
দুচোখ ভরে দেখি আমার স্নেহময়ী মাকে ।
ঘুমায় যখন সারাটা দেশ নিশুতি রাত নামে
কাজের শেষে বাড়ীর দোরে চরণ আমারₕ থামে
যখন দেখি দুটি পথ চাওয়া চোখ দরজাটার ওই ফাঁকে
দেখি অন্ন নিয়ে রাত জাগা মোর অন্নপূর্ণা মাকে ।
আত্মীয় আর স্বজন যখন করে অবহেলা
ধনির সমাজ গরীব বলে করে হেলা ফেলা
তখন গল্প কথায় ভোলায় যে মোর মনের দুঃখটাকে
তারই মাঝে দেখি আমার করুণাময়ী মাকে ।
এমনি করেই সব কটা দিন কাটিয়ে যাব আমি
মা যে আমার তিন ভূবনের সোনার চেয়ে দামী,
কলহ ভুলে সারা দেয় মায়ের হাজার ডাকে
দেখবো শুধু বিভোর হয়ে মায়ের মমতাকে ।
Ami Hariyechi Mor Chottobela (Romanized Version)
Ami hariyechi mor chottobela haraini tomake
Ajo amay ghire ma je amar shob khanetei thake.
Jokhon dekhi karo ghore chotto khuku hashe
Mishti mayer mukhti amar chokher upor bhashe.
Icche kore duhat diye joriye dhori take
Ador kori abar ami amar shona make.
Mathay shindur kopale tip chulti elo kore
Dekhi jokhon kono meye jaygo pujar ghore,
Shuni jokhon shei she bodhu fu diye jay shakhe
Chokher upor dekhi ami lokkhi amar make.
Behush hoye ekla jokhon thaki jorer ghore
Kopale jol poti dey jay go batash kore,
Amar mathay jokhon komol she hat poroshti tar rakhe
Duchokh bhore dekhi amar snehomoyi make.
Ghumay jokhon sharata desh nishuti rat name
Kajer sheshe barir dore choron amar thame
Jokhon dekhi duti poth chawa chokh dorjatar oi fake
Dekhi onno niye rat jaga mor onnopurna make.
Attiyo ar shojon jokhon kore obohela
Dhonir shomaj gorib bole kore hela fela
Tokhon golpo kothay bholay je mor moner dukkhotake
Tari majhe dekhi amar korunamoyi make.
Emni korei shob kota din katiye jabo ami
Ma je amar tin bhuboner shonar cheye dami,
Koloho bhule shara dey mayer hajar dake
Dekhbo shudu bibhor hoye mayer momotake.
গানের মূল ভাব ও চরণ বিশ্লেষণ
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহজ-সরল অথচ গভীর লেখনীতে মায়ের বিভিন্ন রূপকে তুলে ধরা হয়েছে, যা মান্না দের দরদভরা কণ্ঠে জীবন্ত হয়ে উঠেছে:
- মায়ের সর্বব্যাপী উপস্থিতি ও স্মৃতিচারণ: “আমি হারিয়েছি মোর ছোট্টবেলা হারাইনি তোমাকে…” — বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের শৈশব হারিয়ে যায়, কিন্তু মায়ের স্মৃতি কখনো ধূসর হয় না। জগতের প্রতিটি নিষ্পাপ শিশুর হাসির মাঝে সন্তান তাঁর মায়ের সেই চিরচেনা মিষ্টি মুখটিই খুঁজে পান। মায়ের প্রতি সন্তানের এই টান চিরন্তন।
- ঐতিহ্যবাহী ও ঘরোয়া রূপক (লক্ষ্মী ও অন্নপূর্ণা): গানে মাকে বাঙালি সংস্কৃতির দুটি প্রধান মাতৃ-রূপের সাথে তুলনা করা হয়েছে। পূজার ঘরে যাওয়া কোনো বধূর শাঁখ বাজানোর পবিত্র শব্দের মাঝে সন্তান খুঁজে পান তাঁর ‘লক্ষ্মী মা’-কে। আবার দিনশেষে যখন ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন, তখন দরজার ফাঁকে অন্ন (খাবার) হাতে রাত জেগে পথ চেয়ে থাকা মায়ের মাঝে দেখতে পান ‘অন্নপূর্ণা’ রূপ। মায়ের এই ত্যাগ ও ভালোবাসার কোনো বিকল্প হয় না।
- সংকটে পরম আশ্রয় ও পরম সান্ত্বনা: “বেহুস হয়ে একলা যখন থাকি জ্বরের ঘোরে…” — অসুস্থতার যন্ত্রণায় মায়ের শীতল হাতের পরশ ও জলপট্টি যেমন সমস্ত কষ্ট দূর করে দেয় (স্নেহময়ী রূপ), ঠিক তেমনি সমাজ বা আত্মীয়-স্বজন যখন দারিদ্র্যের কারণে অবহেলা করে, মা তখন তাঁর আঁচলের মায়ায় এবং সান্ত্বনার গল্পে সন্তানের সব দুঃখ ভুলিয়ে দেন (করুণাময়ী রূপ)।
- মায়ের শ্রেষ্ঠত্ব ও আত্মোৎসর্গ: “মা যে আমার তিন ভূবনের সোনার চেয়ে দামী…” — গানের শেষাংশে কবি ঘোষণা করেছেন যে, মা এই পৃথিবীর সমস্ত ধন-সম্পদ বা সোনার চেয়েও মূল্যবান। জগতের সব কোলাহল, দ্বন্দ ও কলহ ভুলে সন্তান শুধু মায়ের সেই অকৃত্রিম ও নিঃস্বার্থ মমতার সাগরে বিভোর হয়ে বেঁচে থাকতে চান।
উৎস (Sources)
এই নিবন্ধের লিরিক্স এবং আনুষঙ্গিক তথ্যাদি কণ্ঠশিল্পী মান্না দের মূল এইচএমভি (HMV) / সারেগামা ডিসকোগ্রাফি, বাংলা চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক রেকর্ডস এবং বিংশ শতাব্দীর আশির দশকের জনপ্রিয় আধুনিক ও ভক্তিগীতি সংকলন থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।