কেউ হতে চায় ডাক্তার, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার – নচিকেতা চক্রবর্তী

নব্বইয়ের দশকের বাংলা আধুনিক গানের ধারায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের নাম নচিকেতা চক্রবর্তী। তাঁর হাত ধরে বাংলা সংগীতে ‘জীবনমুখী’ ধারার যে জোয়ার এসেছিল, ‘অ্যাম্বিশন’ গানটি তারই একটি উজ্জ্বল ও কালজয়ী দৃষ্টান্ত। গানটির গীতিকার, সুরকার এবং মূল কণ্ঠশিল্পী স্বয়ং নচিকেতা চক্রবর্তী। সমকালীন সমাজব্যবস্থার অবক্ষয়, পেশাগত অনৈতিকতা এবং ইঁদুরদৌড়ের প্রতিযোগিতাকে তীব্র ব্যঙ্গ ও শ্লেষের মাধ্যমে তিনি এই গানটিতে ফুটিয়ে তুলেছেন।

গানটির সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে রয়েছে মধ্যবিত্ত সমাজের তথাকথিত সাফল্যের সংজ্ঞা এবং অন্ধ অনুকরণপ্রিয়তার বিরুদ্ধে এক গভীর সামাজিক প্রতিবাদ। সমাজ যখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা ব্যারিস্টার হওয়াকেই একমাত্র সফল জীবন হিসেবে গণ্য করে, তখন নচিকেতা সেই প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর বিরুদ্ধে গিয়ে একজন ভবঘুরে, বাউল কিংবা বোকা হওয়ার ইচ্ছাকে নিজের জীবনের আসল লক্ষ্য বা অ্যাম্বিশন হিসেবে ঘোষণা করেন। গানটি প্রকাশের পর থেকেই পুঁজিবাদী সমাজের যাঁতাকলে পিষ্ট তরুণ প্রজন্মের কাছে এক অনন্য বিদ্রোহ ও আত্মদর্শনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

বাংলা সংস্করণ (কেউ হতে চায় ডাক্তার কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার)

কেউ হতে চায় ডাক্তার, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার,

কেউ হতে চায় ব্যবসায়ী কেউ বা ব্যারিস্টার,

কেউ চায় বেচতে রূপোয় রূপের বাহার চুলের ফ্যাশান,

আমি ভবঘুরেই হব, এটাই আমার অ্যাম্বিশন।

ঠকানোই মূল মন্ত্র, আজকের সব পেশাতে,

পিছপা নয় বিধাতাও, তেলেতে জল মেশাতে।

ডাক্তার ভুলছে শপথ, ঘুষ খায় ইঞ্জিনিয়ার,

আইনের ব্যবচ্ছেদে, ডাক্তার সাজে মোক্তার।

যদি চাও সফলতা, মেনে নাও এই সিস্টেম,

ফেলে দাও স্রোতের মুখে, आदर्श বিবেক ও প্রেম।

এ সমাজ মানবে তোমায়, গাইবে তোমারই জয়গান,

আমি কোনো বাউল হব, এটাই আমার অ্যাম্বিশন।

বড় যদি চাইবে হতে, সেখানেও লোক ঠকানো,

সৎভাবে বাঁচো বাঁচাও, একথা লোক ঠকানো।

সৎভাবে যাবে বাঁচা, বড় হওয়া যাবে না গো,

শুধু কথা না শুনে, বড়দের দেখেই শেখো।

এ সবই থাক তোমাদের, আমি বড় চাই না হতে,

ধুলো মাখা পথই আমার, তুমি চড়ো জয়রথে।

শত লাঞ্ছনা দিও, কোরো আমায় অসম্মান,

তবু আমি বোকাই হব, এটাই আমার অ্যাম্বিশন।

কেউ হতে চায় ডাক্তার, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার,

কেউ হতে চায় ব্যবসায়ী, কেউ বা ব্যারিস্টার,

কেউ চায় বেচতে রূপোয়, রূপের বাহার চুলের ফ্যাশান,

আমি ভবঘুরেই হব, এটাই আমার অ্যাম্বিশন।

আমি কোনো বাউল হব, এটাই আমার অ্যাম্বিশন।

তবু আমি বোকাই হব, এটাই আমার অ্যাম্বিশন।

Keu Hote Chay Daktar Keu Ba Engineer (Romanized Version)

Keu hote chay daktar, keu ba engineer,

Keu hote chay beboshayi keu ba barrister,

Keu chay bechte rupoy rupor bahar chuler fashion,

Ami bhoboghurei hobo, etai amar ambition.

Thokanoi mul montro, aajker sob peshate,

Pichpa noy bidhatao, telete jol meshate.

Daktar bhulche shopoth, ghush khay engineer,

Ainer bebocchede, daktar saje moktar.

Jodi chao shofolota, mene nao ei system,

Phele dao sroter mukhe, adorsho bibek o prem.

E shomaj manbe tomay, gaibe tomar-i joygaan,

Ami kono baul hobo, etai amar ambition.

Boro jodi chaibe hote, shekhane-o lok thokano,

Sothbhabe bacho bachao, ekotha lok thokano.

Sothbhabe jabe bacha, boro howa jabe na go,

Shudu kotha na shune, boroder dekhei shekho.

E shobi thak tomader, ami boro chai na hote,

Dhulo makha poth-i amar, tumi choro joyrothe.

Shoto lanchona dio, koro amay oshomman,

Tobu ami bokai hobo, etai amar ambition.

Keu hote chay daktar, keu ba engineer,

Keu hote chay beboshayi, keu ba barrister,

Keu chay bechte rupoy, rupor bahar chuler fashion,

Ami bhoboghurei hobo, etai amar ambition.

Ami kono baul hobo, etai amar ambition.

Tobu ami bokai hobo, etai amar ambition.

গানের সুর ও ভাবার্থ বিশ্লেষণ

সুরের ধরন: গানটি মূলত আধুনিক বাংলা জীবনমুখী সংগীতের ধারায় রচিত। এর সুর সংযোজন অত্যন্ত সরল অথচ সাবলীল ও গতিশীল, যা শ্রোতাকে গানের কথার প্রতি গভীরভাবে মগ্ন হতে সাহায্য করে। এতে কোনো নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় রাগের জটিল প্রয়োগ নেই, বরং সাধারণ অ্যাকোস্টিক গিটার, তালবাদ্য এবং ওয়েস্টার্ন কর্ডের সহজ সংমিশ্রণে একটি ছন্দ তৈরি করা হয়েছে, যা গানটিকে একটি চমৎকার কথ্য বা আবৃত্তিমূলক রূপ দান করেছে।

গানের মূল ভাব: এই গানের মূল ভাব হলো আধুনিক সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, দুর্নীতি এবং ইঁদুরদৌড়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক তীব্র শ্লেষাত্মক প্রতিবাদ। এখানে কবি দেখিয়েছেন কীভাবে বর্তমান সমাজব্যবস্থায় তথাকথিত বড় লোক বা সফল হতে গেলে মানুষকে নিজের বিবেক, আদর্শ ও মানবিক প্রেম বিসর্জন দিতে হয়। প্রচলিত এই ক্ষয়ে যাওয়া সিস্টেমের অংশ না হয়ে বরং একজন সৎ ‘ভবঘুরে’, ‘বাউল’ কিংবা সমাজের চোখে ‘বোকা’ হয়ে থাকা অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ ও আত্মতৃপ্তির, এই জীবনদর্শনই এখানে ব্যক্ত হয়েছে।

বিশেষত্ব: নচিকেতার গায়কী ও পরিবেশনার নিজস্ব ভঙ্গিই এই গানের প্রধান বিশেষত্ব। অত্যন্ত স্পষ্ট উচ্চারণ এবং তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক সুরের মাধ্যমে তিনি সমাজের কুৎসিত সত্যগুলোকে সরাসরি শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেছেন। পূর্বের খসড়া টেক্সটে থাকা যান্ত্রিক ত্রুটি ও বানান ভুলগুলো সংশোধন করে এর আসল কাব্যিক ও নির্ভুল রূপটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা শ্রোতার মনে এক গভীর আত্মবিশ্লেষণের জন্ম দেয়।

উৎস (Sources)

নচিকেতা চক্রবর্তীর অফিশিয়াল মিউজিক অ্যালবাম ডিস্কোগ্রাফি, আধুনিক জীবনমুখী বাংলা গানের প্রামাণ্য ইতিহাস সংকলন এবং নির্ভরযোগ্য সংগীত বিষয়ক ডিজিটাল আর্কাইভ থেকে এই তথ্য ও লিরিক যাচাই করা হয়েছে।