আমার সোনা, চাঁদের কণা, ভুবনে তুলনা নাই রে – প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়

কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া “আমার সোনা, চাঁদের কণা, ভুবনে তুলনা নাই রে” গানটি বাংলা সংগীত জগতে বাৎসল্য রস বা মাতৃত্বের চিরন্তন আবেগের এক অনন্য দলিল। গীতিকার প্রণব রায়ের চমৎকার লেখনী এবং নিতাই ঘটকের মধুর সুরে এই গানটিতে একটি শিশুর জন্ম থেকে শুরু করে তার বড় হয়ে ওঠা, পাঠশালায় যাওয়া এবং পরিশেষে বিয়ে করে সংসারী হওয়া পর্যন্ত একজন মায়ের জীবনের পরম সুখ, উদ্বেগ ও ভালোবাসার গল্প কালানুক্রমিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত মিষ্টি ও দরদভরা কণ্ঠ গানটিকে প্রতিটি বাঙালি মায়ের হৃদয়ের স্পন্দন বানিয়ে তুলেছে।

গানের তথ্য

শিরোনামতথ্য
গানের নামআমার সোনা, চাঁদের কণা, ভুবনে তুলনা নাই রে
শিল্পীপ্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়
গীতিকারপ্রণব রায়
সুরকারনিতাই ঘটক
গানের ধরনআধুনিক বাংলা গান (মাতৃত্বপ্রধান / বাৎসল্য রস)

আমার সোনা, চাঁদের কণা (মূল লিরিক্স)

আমার সোনা, চাঁদের কণা, ভুবনে তুলনা নাই রে—–

আমার সোনা, চাঁদের কণা, ভুবনে তুলনা নাই রে—–

শত বরষ পরমায়ু হোক, ঘুচুক যতো বালাই রে |

প্রথম বরষে আলো করে রয় মানণির কোলে রে,

মিটি মিটি হাসে গোপাল আমার মায়ের হিয়া দোলে রে,

কভু আনন্দে আপন মনে রাঙা হাতে দেয় তাই রে ||

দু’বছরে যবে পা দেয় খোকন আধো আধো কথা কয় রে,

فেলিয়া পালায় দুধের বাটি তাই কি ছুঁতে ভয় রে,

সারাটি বেলা দস্যি ছেলে, পিছে পিছে ধাই রে ||

তৃতীয় বরষে সোনামণি মোর বলে, “মাগো কাঁদিস নে’,

কাঠের ঘোড়ার পঙ্খীরাজে চড়ে দিগ্বিজয়ে যায় সে—–

মার আঁখিতারা ধ্রুবতারা হয়ে জেগে থাকে সদাই রে ||

পঞ্চম বরষে বুদ্ধি লয়ে বাবু পাঠশালাতে যায় রে

মার স্নেহময় আঁখি দুটি শুধু ফিরে ফিরে চায় রে——

মা ভাবে মনে, এত ছেলে আছে এমন কোনোটি আর নাই রে ||

দিনে দিনে সোনা চাঁদের সমান নিতি বড়ো হয়ে ওঠে রে,

পুষ্পকলিতে মধু বসন্তে তাল মেনে যেন ফোটেরে—–

প্রজাপতি আসে রঙিন পাখায়, দুয়ারে বাজে সানাই রে ||

একদিন খোকা mala চন্দনে বরবেশে সে যে যায় রে,

উলু দেয় মা বধূবরণে, শঙ্খ লয়ে বাজায় রে—–

মায়ের পরানে এত সুখ বুঝি রাখিবার নাহি ঠাঁই রে ||

Amar Shona, Chander Kona (Romanized Version)

Amar shona, chander kona, bhubone tulona nai re—–

Amar shona, chander kona, bhubone tulona nai re—–

Shoto borosh poromayu hok, ghuchuk joto balai re.

Prothom boroshe alo kore roy manonir kole re,

Miti miti hashe gopal amar mayer hiya dole re,

Kobhu anonde apon mone ranga hate dey tai re.

Du’bochore jobe pa dey khokon adho adho kotha koy re,

Feliya palay dudher bati tai ki chute bhoy re,

Sharati bela doshyi chele, piche piche dhai re.

Triti-yo boroshe shonamoni mor bole, “mago kandis ne’,

Kather ghorar ponkhiraje chore digbijoye jay she—–

Mar akhitara dhrubotara hoye jege thake sodai re.

Ponchom boroshe buddhi loye babu pathshalate jay re

Mar snehomoy akhi duti shudu fire fire chay re——

Ma bhabe mone, eto chele ache emon konoti ar nai re.

Dine dine shona chander shoman niti boro hoye othe re,

Pushpokolite modhu boshonte tal mene jeno fote re—–

Projapoti aashe rongin pakhay, duyaare baje shanai re.

Ekdin khoka mala chondone borbeshe she je jay re,

Ulu dey ma bodhuborone, shonkho loye bajay re—–

Mayer porane eto shukh bujhi rakhibar nahi thai re.

গানের মূল ভাব ও চরণ বিশ্লেষণ

গানটির মূল উপজীব্য হলো—‘সন্তানের প্রতি মায়ের নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং মাতৃত্বের পূর্ণতা’। এখানে একটি শিশুর শৈশব থেকে যৌবনের প্রতিটি ধাপকে অত্যন্ত নিখুঁত ও আবেগময়ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে:

শৈশব ও চঞ্চলতা (১ম ও ২য় বছর): গানের শুরুতে সন্তানের দীর্ঘায়ু কামনা করে মা তার শিশুর প্রথম হাসিতে নিজের হৃদয় আন্দোলিত হওয়ার কথা বলেন। দ্বিতীয় বছরে শিশুর আধো-আধো কথা বলা এবং দুধের বাটি ফেলে পালিয়ে যাওয়ার দুষ্টুমির পেছনে মায়ের সারাদিন ছুটে চলার মাঝে এক মধুর মাতৃত্বের ক্লান্তি প্রকাশ পায়।

কল্পনা ও সামাজিক উত্তরণ (৩য় ও ৫ম বছর): তৃতীয় বছরে শিশু যখন কাঠখড় দিয়ে গড়া ঘোড়াকে ‘পঙ্খীরাজ’ কল্পনা করে অবুঝ মনে খেলায় মত্ত হয়, মা তখন তার চোখের মণি বা ‘ধ্রুবতারা’ হিসেবে তাকে আগলে রাখেন। পঞ্চম বছরে যখন শিশু প্রথম পাঠশালায় পা রাখে, তখন দূর থেকে মায়ের স্নেহময় চোখ সন্তানের দিকে চেয়ে গর্ব অনুভব করে যে, পৃথিবীর সব শিশুর চেয়ে তার সন্তানই সেরা।

পূর্ণতা ও শুভপরিণতি: সময়ের নিয়মে শিশু যখন বসন্তের ফুলের মতো প্রস্ফুটিত হয়ে যৌবনে পা দেয়, তখন ঘরে সানাই বাজে। পরিশেষে, একদিন সেই সন্তান যখন বরবেশে বিয়ে করে নতুন বধূ ঘরে নিয়ে আসে, তখন উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে মায়ের জীবনের সমস্ত ত্যাগ ও সাধনা এক পরম তৃপ্তি ও সুখে রূপ নেয়, যা ধারণ করার জায়গা মায়ের বুকেও ছোট মনে হয়।

উৎস (Sources)

এই নিবন্ধের লিরিক্স এবং সংগীতের ঐতিহাসিক তথ্যসমূহ প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিশিয়াল গ্রামোফোন রেকর্ড ডিসকোগ্রাফি, প্রণব রায়ের গীতি-সংকলন এবং আকাশবাণী ও এইচএমভি (HMV) গোল্ডেন কালেকশনের নির্ভরযোগ্য আধুনিক বাংলা গানের আর্কাইভ থেকে সংগৃহীত ও যাচাইকৃত।