বাংলা জীবনমুখী গানের জগতে নচিকেতা চক্রবর্তী এক অনন্য নাম। তাঁর অত্যন্ত গভীর, বাস্তববাদী এবং দার্শনিক একটি সৃষ্টি হলো ‘अंतবিহীন পথ চলাই জীবন’। গানটিতে জীবনের কোনো রোমান্টিক বা কাল্পনিক রূপ নয়, বরং সমাজের রূঢ় বাস্তবতা, অস্তিত্বের সংকট, শ্রেণীসংগ্রাম এবং মানুষের ভেতরের দ্বান্দ্বিক রূপকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। নচিকেতার চাবুকের মতো ধারালো শব্দচয়ন এই গানে জীবনকে এক নতুন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করেছে।
Table of Contents
গানের মূল তথ্য
| গানের নাম | অন্তবিহীন পথ চলাই জীবন |
| কণ্ঠশিল্পী | নচিকেতা চক্রবর্তী |
| গীতিকার | নচিকেতা চক্রবর্তী |
| সুরকার | নচিকেতা চক্রবর্তী |
| গানের ধরন | জীবনমুখী গান / দার্শনিক ও সামাজিক গীতি |
শিল্পী ও প্রেক্ষাপট পরিচিতি
নব্বইয়ের দশকে বাংলা গানের চেনা গতিপথ বদলে দিয়ে নচিকেতা চক্রবর্তী যে ‘জীবনমুখী’ ধারার সূচনা করেছিলেন, এই গানটি তারই একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সমসাময়িক জীবনের জটিলতা, মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনের গল্পই নচিকেতার গানের মূল উপজীব্য।
‘অন্তবিহীন পথ চলাই জীবন’ গানটির প্রেক্ষাপট দাঁড়িয়ে আছে এক গভীর জীবনদর্শনের ওপর। কবি এখানে জীবনকে কেবল একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় বাঁধেননি। তাঁর চোখে ফুটপাতের বেওয়ারিশ শিশু যেমন জীবন, তেমনই রাম-ইসলাম-যিশুর মতো ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসও জীবনের অংশ। জীবনের এই বহুমুখী ও বৈপরীত্যময় রূপকে তুলে ধরে নচিকেতা সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে এক বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন।
গানের সম্পূর্ণ পাঠ
অন্তবিহীন পথ চলাই জীবন সম্পূর্ণ গান
অন্তবিহীন পথ চলাই জীবন
শুধু জীবনের কথা বলাই জীবন।
জীবন প্রসব করে চলাই জীবন,
শুধু যোগ বিয়োগের খেলাই জীবন।
শুধু সূর্যের পানে দেখাই জীবন,
জীবনকে ভোগ করে একাই জীবন,
একই কক্ষপথে ঘোরাই জীবন,
স্বপনের সমাধি খোঁড়াই জীবন,
মনের গোপন ঘরে, যে শাপদ ঘর করে,
তাকেই লালন করে চলাই জীবন।
ফুটপাথে বেওয়ারিশ শিশুরা জীবন,
রাম, ইসলাম আর যিশুরা জীবন,
ওষুধের বিষপান করাই জীবন,
চিকিৎসাহীন হয়ে মরাই জীবন।
যে মেয়েটা রোজ রাতে, বদলায় হাতে হাতে,
তার অভিশাপ নিয়ে চলাই জীবন।
প্রতিবাদ প্রতিরোধে নামাই জীবন,
লক্ষ্যে পৌঁছে তবে থামাই জীবন,
স্বপ্নে বেচাকেনা করাই জীবন,
দেয়ালে ঠেকলে পিঠ লড়াই জীবন,
প্রতিদিন ঘরে ফিরে, অনেক হিসেব করে,
‘এ জীবন চাই না’, তা বলাই জীবন।
Ontobihin Poth Cholai Jibon Romanized Version
Ontobihin poth cholai jibon
Shudu jiboner kotha bolai jibon.
Jibon proshob kore cholai jibon,
Shudu jog biyoger khelai jibon.
Shudu surjer pane dekhai jibon,
Jibonke bhog kore ekai jibon,
Eki kokkhopothe ghorai jibon,
Shoponer somadhi khorai jibon,
Moner gopon ghore, je shapod ghor kore,
Takei lalon kore cholai jibon.
Futpathe bewarish shishura jibon,
Ram, Islam ar Jishura jibon,
Oshudher bishpan korai jibon,
Chikitshahin hoye morai jibon.
Je meyeta roj rate, bodlay hate hate,
Tar obhishap niye cholai jibon.
Protibad protirodhe namai jibon,
Lokkkhe pouche tobe thamai jibon,
Shopne becha kena korai jibon,
Deyale thekle pith lorai jibon,
Protidin ghore phire, onek hisheb kore,
‘E jibon chai na’, ta bolai jibon.
গানের মূল ভাব ও চরণ বিশ্লেষণ
গানটির মূল থিম বা দর্শন হলো জীবনের বাস্তবধর্মী ও বহুমুখী সংজ্ঞা। নচিকেতা এখানে দেখিয়েছেন জীবন কোনো সরলরেখা নয়; এটি একই সাথে স্বপ্নভঙ্গ, একাকীত্ব, সামাজিক বৈষম্য এবং লড়াইয়ের এক জটিল কোলাজ। মনের ভেতরের অন্ধকার বা ‘শাপদ’ (হিংস্র জন্তু)-কে লালন করা যেমন জীবন, তেমনি ফুটপাতের অনাথ শিশু কিংবা পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য হওয়া নারীর অভিশাপ বয়ে বেড়ানোও এই সমাজেরই জীবনের আরেকটি অন্ধকার রূপ।
শব্দবিন্যাস ও ছন্দের দিক থেকে গানটি অত্যন্ত ক্ষুরধার ও সোজা সাপটা। নচিকেতা এখানে কোনো আলঙ্কারিক শব্দের আড়ালে সত্যকে ঢাকেননি। ‘দেয়ালে ঠেকলে পিঠ লড়াই জীবন’ কিংবা ‘ওষুধের বিষপান করাই জীবন’-এর মতো লাইনগুলো সমাজের রূঢ় চিকিৎসাব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের নিরুপায় বেঁচে থাকাকে ইঙ্গিত করে। গানের শেষ দুটি চরণ সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ—সারাদিন বেঁচে থাকার লড়াই শেষে, মধ্যবিত্ত মানুষ যখন ঘরে ফিরে হিসেব মেলাতে না পেরে ক্লান্তিতে বলে ওঠে ‘এ জীবন চাই না’, সেই পরম আক্ষেপ ও ক্লান্তির নামই আসলে জীবন।
এই গানের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর সর্বজনীনতা ও নির্মম সত্য প্রকাশ। গানটি শ্রোতাকে সস্তা সান্ত্বনা দেয় না, বরং জীবনের মুখোমুখি এনে দাঁড় করায়। নচিকেতার দরাজ কণ্ঠ এবং হারমোনিয়াম ও গিটারের যুগলবন্দিতে এই গানটি কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম থাকে না, হয়ে ওঠে মানবজীবনের এক জীবন্ত ও বাস্তব দলিল।
উৎস (Sources)
এই নিবন্ধের লিরিক্স এবং সাঙ্গীতিক তথ্যসমূহ নচিকেতা চক্রবর্তীর অফিশিয়াল ডিসকোগ্রাফি, নব্বইয়ের দশকের জীবনমুখী আধুনিক বাংলা গানের ক্যাসেট আর্কাইভ এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তাঁর নির্ভরযোগ্য লিরিক সংকলন থেকে সংগ্রহ ও নিখুঁতভাবে যাচাই করা হয়েছে।