বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণযুগের এক ক্লাসিক ও মধুময় সৃষ্টি ‘অন্তর-মন্দির মাঝে সুন্দর এলে এ কী সাজে’। প্রখ্যাত গীতিকার শৈলেন রায়ের চমৎকার লেখনী এবং কিংবদন্তি গায়ক ও সুরকার কৃষ্ণচন্দ্র দে-র অনন্য কণ্ঠ ও সুরের জাদুতে এই গানটি বাঙালি শ্রোতাদের মনে এক স্বর্গীয় অনুভূতির সৃষ্টি করে। অন্তরের আনন্দ এবং প্রিয়তমের আগমনে প্রকৃতির রূপান্তরের এক অপূর্ব চিত্রায়ণ ঘটেছে এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর গানটিতে।
Table of Contents
গানের মূল তথ্য
| গানের নাম | অন্তর-মন্দির মাঝে সুন্দর এলে এ কী সাজে |
| কণ্ঠশিল্পী | কৃষ্ণচন্দ্র দে |
| গীতিকার | শৈলেন রায় |
| সুরকার | কৃষ্ণচন্দ্র দে |
| গানের ধরন | ক্লাসিক আধুনিক বাংলা গান / রোমান্টিক-ভক্তিগীতি |
শিল্পী ও প্রেক্ষাপট পরিচিতি
কৃষ্ণচন্দ্র দে (১৮৯৩ – ১৯৬২) ছিলেন বাংলা সঙ্গীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি অন্ধত্বকে জয় করে তাঁর অসাধারণ কণ্ঠ ও সুর সৃষ্টির মাধ্যমে অমর হয়ে আছেন। তিনি ছিলেন বিখ্যাত গায়ক মান্না দে-র কাকা এবং প্রথম সঙ্গীতগুরু। সমসাময়িক কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকার শৈলেন রায়ের সাথে তাঁর জুটি বহু স্মরণীয় গান উপহার দিয়েছে।
এই গানটির প্রেক্ষাপট আধ্যাত্মিক ভক্তি এবং মানবিক প্রেমের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। এখানে ‘সুন্দর’ বা প্রিয়তমের আগমনকে কেবল সাধারণ কোনো দেখা হওয়া হিসেবে দেখানো হয়নি, বরং তা হৃদয়ের গভীর মনিকোঠায় বা ‘অন্তর-মন্দিরে’ এক পরম উৎসবের মতো। কৃষ্ণচন্দ্র দে-র গুরুগম্ভীর অথচ দরদি গায়কী গানটিকে এক উচ্চমার্গীয় তাত্ত্বিক রূপ দান করেছে।
গানের সম্পূর্ণ পাঠ
অন্তর-মন্দির মাঝে সুন্দর এলে এ কী সাজে সম্পূর্ণ গান
অন্তর-মন্দির মাঝে
সুন্দর এলে এ কী সাজে!
চাঁদ হাসে, ফোটে ফুল বনে।
চঞ্চল এলে যবে প্রাণে
অম্বর ভরে ওঠে গানে—-
কাঁপে হিয়া সুখ শিহরণে।
Antor-Mondir Majhe Shundor Ele E Ki Shaje Romanized Version
Antor-mondir majhe
Shundor ele e ki shaje!
Chad hase, phote phul bone.
Chonchol ele jobe prane
Ombor bhore othe gane—-
Kape hiya sukh shihorone.
গানের মূল ভাব ও চরণ বিশ্লেষণ
গানটির মূল থিম বা দর্শন হলো প্রিয়তম বা পরমেশ্বরের আগমনে মানুষের অন্তরে এবং বহির্বিশ্বে যে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়, তারই এক কাব্যিক উদ্যাপন। মনকে এখানে ‘অন্তর-মন্দির’ এবং কাঙ্ক্ষিত সত্তাকে ‘সুন্দর’ ও ‘চঞ্চল’ রূপে কল্পনা করা হয়েছে। যখন সেই পরম সুন্দর মনের আঙিনায় এসে দাঁড়ায়, তখন সমস্ত জগত এক মায়াবী সাজে সজ্জিত হয়।
গানটির শব্দশৈলী অত্যন্ত মার্জিত এবং ধ্রুপদী ঘরানার। ‘অম্বর’ (আকাশ) গানে ভরে ওঠা কিংবা ‘হিয়া’ (হৃদয়) সুখ শিহরণে কেঁপে ওঠার মতো উপমাগুলো মনের ভেতরের গভীর আনন্দকে দৃশ্যমান করে তোলে। প্রকৃতির উপাদান যেমন—চাঁদের হাসি ও বনের ফুল ফোটার মধ্য দিয়ে কবি দেখিয়েছেন যে, ভেতরের আনন্দ কীভাবে বাইরের প্রকৃতিকেও আন্দোলিত করে।
এই গানের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর সংক্ষিপ্ততা ও সুরের গাম্ভীর্য। খুব কম কথায় কৃষ্ণচন্দ্র দে ও শৈলেন রায় মিলে প্রেমের ও ভক্তির যে চিরন্তন রূপটি এঁকেছেন, তা শ্রোতার মনকে এক নিমেষে শান্ত ও আবিষ্ট করে ফেলে। বিগত শতাব্দীর প্রথমার্ধের রাগপ্রধান আধুনিক গানের যে ঐতিহ্য, এই সৃষ্টিটি তার অন্যতম একটি সফল প্রতিনিধি।
উৎস (Sources)
এই নিবন্ধের লিরিক্স এবং সাঙ্গীতিক তথ্যসমূহ এইচএমভি (HMV) ও আদি গ্রামোফোন রেকর্ডস-এর ডিসকোগ্রাফি আর্কাইভ, শৈলেন রায়ের নির্বাচিত গীতি-সংকলন এবং প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ কৃষ্ণচন্দ্র দে-র জীবনী ও সাঙ্গীতিক নথিপত্র থেকে সংগ্রহ ও নিখুঁতভাবে যাচাই করা হয়েছে।