সুরসম্রাট শচীনদেব বর্মণের কণ্ঠে ‘আজো আকাশের পথ বাহি চাঁদ আসে’ গানটি যেন এক গভীর বিষণ্ণতা ও সুরের এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কলমে বিরহের যে কাব্যিক রূপ ফুটে উঠেছে, শচীনকর্তার ভরাট ও মরমী কণ্ঠে তা এক কালজয়ী মহাকাব্যে রূপ নিয়েছে। গোধূলির ছায়া, ঝরা মাধবীর মালা এবং ভেঙে যাওয়া বাঁশির সুর—এই সব রূপকের মাধ্যমে শিল্পী একাকীত্বের এক অনন্য চিত্র তুলে ধরেছেন।
Table of Contents
গানের তথ্য
| গানের নাম | আজো আকাশের পথ বাহি চাঁদ আসে |
| কণ্ঠশিল্পী | শচীনদেব বর্মণ |
| গীতিকার | গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার |
| সুরকার | শচীনদেব বর্মণ |
| গানের ধরন | আধুনিক বাংলা গান / বিরহী গীতি |
শিল্পী ও প্রেক্ষাপট পরিচিতি
শচীনদেব বর্মণ মানেই মাটির কাছাকাছি এক সুরের জগত, যেখানে আধুনিকতা ও লোকজ সুরের এক অসামান্য সমন্বয় ঘটত। এই গানে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা কথাগুলো শচীনকর্তার সুরে এক বিষাদময় আভিজাত্য পেয়েছে। বিরহ যে কেবল কান্নার নাম নয়, বরং এক ধরনের শান্ত প্রতীক্ষাও—তা এই গানে ফুটে উঠেছে। শচীনকর্তার গায়কীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর কন্ঠের সেই অদ্ভুত টান, যা যেকোনো গানকে শ্রোতার হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে দিত। বিরহের সুর বাঁধার ক্ষেত্রে শচীনদেব বর্মণ ও গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের এই জুটি বাংলা গানের ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ।
আজো আকাশের পথ বাহি চাঁদ আসে
আজো আকাশের পথ বাহি চাঁদ আসে
মোর ব্যথা গোধূলীর ছায়াতীরে।
ঝরা মাধবীর ম্লান মালাখানি
শপথের স্মৃতি যে গেল ছিঁড়ে।
সুর যেন ভুলে গেছে ভাঙ্গা বাঁশী
প্রেম মোর কাঁদে আর আমি হাসি
নাহি জানি কেন তবু মনে আসে
মিলনের সেই রাতে ছিলে পাশে
প্রদীপের স্বপ্ন হল ঐ ভুল—
নিভে যেতে চায় ধীরে ধীরে।।
ভেঙে কেন দিলে হায় সব খেলা
তুমি যেন রেখে গেছ অবহেলা
যতটুকু তব আজো আছে বাকি
তারি লাগি তোমারে যে কাছে ডাকি
এ হৃদয় কেঁদে কয় ভোল অভিমান
জেগে আছি ওগো তুমি এসো ফিরে।।
Ajo Akasher Poth Bahi Chand Ashe Romanized Version
Ajo akasher poth bahi chand ashe
Mor byatha godhulir chhayatire.
Jhora madhobir mlan malakhani
Shopother smriti je gelo chhire.
Shur jeno bhule geche bhanga bashi
Prem mor kade ar ami hashi
Nahi jani keno tobu mone ashe
Miloner sei rate chhile pashe
Prodiper shopno holo oi bhul—
Nibhe jete chay dhire dhire.
Bhenge keno dile hay shob khela
Tumi jeno rekhe gecho obohela
Jototuku tobo ajo ache baki
Tari lagi tomare je kache daki
E hridoy kede koy bholo obhiman
Jege achi ogo tumi esho phire.
গানের মূল ভাব ও চরণ বিশ্লেষণ
গানটির মূল ভাব হলো—‘স্মৃতির বোঝা আর অভিমানের অবসান’। ‘আজো আকাশের পথ বাহি চাঁদ আসে, মোর ব্যথা গোধূলীর ছায়াতীরে’—এই চরণটি গোধূলির বিষণ্ণতার সাথে কবির হৃদয়ের ব্যথার এক চমৎকার মেলবন্ধন ঘটায়। ‘সুর যেন ভুলে গেছে ভাঙ্গা বাঁশী’—প্রিয়জন চলে যাওয়ার পর জীবনের ছন্দ হারানোর এই উপমাটি অত্যন্ত শক্তিশালী।
গানটির শেষ স্তবকে কবির হৃদয়ের আকুতি সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে ওঠে—‘এ হৃদয় কেঁদে কয় ভোল অভিমান, জেগে আছি ওগো তুমি এসো ফিরে’। এখানে অভিমান ঝেড়ে ফেলে প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা, তা কোনো সাধারণ প্রেমের আবেদন নয়, বরং তা এক নিঃস্ব হৃদয়ের শেষ চেষ্টা। শচীনকর্তার কণ্ঠে ‘ভোল অভিমান’ শব্দবন্ধটি যে করুণ সুর তৈরি করে, তা আজও যেকোনো বিরহী শ্রোতাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এটি এক চিরন্তন বিরহ-গাথা, যা কালের সীমানা পেরিয়ে আজও অমলিন।
উৎস (Sources)
এই নিবন্ধের লিরিক্স এবং সাঙ্গীতিক তথ্যসমূহ শচীনদেব বর্মণের ডিসকোগ্রাফি, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের শ্রেষ্ঠ লিরিক সংকলন এবং আধুনিক বাংলা গানের প্রামাণ্য ডিজিটাল আর্কাইভ থেকে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।