আমিই তো তোমাকে বসুন্ধরার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছি – শিলাজিৎ মজুমদার

বাংলা জীবনমুখী ও অল্টারনেটিভ গানের জগতে শিলাজিৎ মজুমদার বরাবরই চেনা ছকের বাইরের এক কথক। তাঁর বহু গান আসলে মেলোডির চেয়েও বেশি ‘গল্প বলা’ বা ‘স্মৃতিচারণ’। “আমিই তো তোমাকে বসুন্ধরার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছি” গানটি মূলত একটি অনন্য কথ্য-সংগীত (Spoken Word Track)। এটি কোনো সাধারণ গান নয়, বরং এক টুকরো নস্টালজিয়া ও মনস্তাত্ত্বিক ভ্রমণ। একজন মানুষের অবচেতনের কোনো সত্তা বা তার ফেলে আসা শৈশব যেন বর্তমানের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষটাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—কীভাবে এই পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধ, ভয় এবং বাস্তবতার সাথে তার প্রথম পরিচয় ঘটেছিল।

গানের তথ্য

শিরোনামতথ্য
গানের নামআমিই তো তোমাকে বসুন্ধরার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছি
কণ্ঠশিল্পী / পরিবেশকশিলাজিৎ মজুমদার
গানের ধরনআধুনিক বাংলা গান / অল্টারনেটিভ / কথ্য-সংগীত (Spoken Word)
মূল বিষয়বস্তুশৈশবের টুকরো স্মৃতি, ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা, বড় হয়ে ওঠার মনস্তত্ত্ব ও আত্ম-আবিষ্কার

আমিই তো তোমাকে বসুন্ধরার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছি (মূল লিরিক্স)

আমিই তো তোমাকে বসুন্ধরার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছি

সোনাদাদের বাড়ির বাইরের দিকে পোড়ো চানঘর

তার ছাদের ওপর ডুমুর গাছের বাস

নগেন বলে একটা ছেলে একটা প্ল্যাস্টিকের প্যাকেটে

ভর্তি করছিল ডুমুর

সবে তখন বাচ্চা পেড়েছিল সাদা হলদে বেড়ালটা

আমি আলাপ করাইনি ?

আমিই তো তোমাকে ডেকেছিলাম

জানালার শিকের ওপর হুমড়ি খেতে বাধ্য করেছিলাম |

কাজলকাকুর বাবার গরুটার নাম লক্ষ্মী

ঐ ডুমুর গাছের ফাঁক দিয়ে

এক চিলতে জংলা মাঠের ওপর

গর্ভবতী লক্ষ্মী প্ল্যাসেন্টা

আস্তে আস্তে বাছুরটা ভুমিষ্ট হল

উঠে দাঁড়াল

মা লক্ষ্মী চেটে খেল জীবাণু-বীজাণু

শ্যামপার্কে ছিটকে পড়ে গেলে

ছড়ে গেল হাঁটু

স্কুলের নীল প্যান্টটার ছিঁড়ে যাওয়া

ভয়—

কে ছিল তোমার সঙ্গে

গঙ্গা জলের নীচে পড়ে থাকা পলি

সেই পলি তুলে পুতুল গড়ার ব্যর্থ চেষ্টা

বাথরুমের জং ধরা ফ্লাশ-এর ওপর

গোলা পায়রা —পালক —ডিম

সারা দুপুর সবার ঘুমের সুযোগে

বাথরুমের দরজা বন্ধ করে

পায়রা ধরা

একদিন লুকিয়ে খেলে নেভিকাট

মুখে কীরকম গরম লাগছিল

মনে হচ্ছিল পুড়ে যাবে

তবুও ছাড়োনি —-

ধোঁয়ার সঙ্গে প্রথম মোলাকাৎ

নিষিদ্ধ স্বাদ

সাধুপুরির ভগ্নস্তুপ

যে ভাঙা বাড়ির ওপর আগাছা

নাকি আগাছার ওপরেই বাড়িটা

বোঝা যেত না

কেন যে ওটার নাম সাধুপুরি

ভুলে গেছ ?

কিন্তু মনে আছে

টকটকে লাল একটা ফড়িং-এর পেছন পেছন

তাড়া করেছিলে চাটুজ্জেদের শিবমন্দির থেকে

ধাওয়া করতে করতে

পৌঁছে গেছিলে সেই হানা বাড়িটাতে

কী অসম্ভব সুন্দরী সেই ফড়িংটার

পিছু নিতে নিতে

ঢুকে পড়েছিলে সেই পোড়ো বাড়িতে

ماکড়সার জাল—অন্ধকার

অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেছিল ফড়িংটা

বা আটকে গেছিল —- মাকড়সার জালে

হঠাৎ গা ছমছম

একা মনে হয়েছিল তোমার

আমি কিন্তু ছিলাম

তোমার পা পড়ে গেছিল কাঁচা বিষ্ঠায়

অবাক হয়েছিলে —- তালপুকুরের পাথরটার ওপর

কচলে কচলে পা ধুতে ধুতে

ভেবেছিলে কে এত নিশ্চিন্তে পায়খানা

করে এরকম ভুতুরে বাড়িতে

মেজমামুর বাড়ির গন্ধরাজ গাছটা

তার পাশেই বেঁটে জবা গাছটা

তার পাশেই চিনিচম্পা

আর তার পাশে সেই জোড়া পেয়ারা গাছটা

যা তোমার শয্যার মতোই নিরিবিলি ছিল

মগডালে বসে হেলান দিয়ে

কাঁচা পেয়ারার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে

চোখ চলে যেত ইলেকট্রিক পোল

বাঁকা খেজুর গাছটাকে পেরিয়ে

ধানক্ষেত আর ধানক্ষেত

আর ছবির মতো একটা হলদেটে বাড়ি

কাউকে কোনোদিন জিজ্ঞাসা করনি

ওটা কী ?

 

একের পর এক লোক পেরিয়ে যেত

সাইকেলে, হেঁটে, ছাতা মাথায়

ততক্ষণে আইসক্রিমওলা হর্ন বাজাতে শুরু করত

লাল, সবুজ, হলদে, সাদা অমৃত

দশপয়সায় দুটো

কয়েক মুহূর্তের জন্য তুমি একবার হারিয়ে গেছিলেন

ঘুরে দাঁড়িয়ে খুঁজে পাওনি কাউকে

বেলুনওলা, ওমলেটভাজা, নাগরদোলা

छ्यात् করে উঠেছিল তোমার বুকের ভেতর

কান্না পায়নি ?

তখন তুমি একটা পাড়াও চেনো না

পৃথিবী তো দূরের কথা |

আজকে যখন বয়স্ক চোখে

গঙ্গার জলে ভাসতে থাকা

বয়ার গায়ে শ্যাওলা দেখো

কিংবা তールの দিকে অদ্ভুত নোঙরা কিছু

যার নিজস্ব চরিত্র হারিয়ে

এখন নোঙরা—- অজানা হয়ে গেছে

তারই পাশে শিকড়গাড়া

ক্যাপস্টানটা দেখো জং পড়েছে কি না

কিম্বা বাইপাসের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা

কালো কাচের সুমোর ভেতর

ঘনিষ্ঠতা প্রত্যক্ষ করো

মনে রেখো

আমিই তোমাকে পৃথিবীর সঙ্গে আলাপ

করিয়ে দিয়েছিলাম

 

Ami-i To Tomake Boshundhorar Shonge Alap Koriye Diyechi (Romanized Version)

Ami-i to tomake boshundhorar shonge alap koriye diyechi

Shonadader barir bayerer dike poro changhor

Tar chader upor dumur gacher bash

Nogen bole ekta chele ekta plastic-er packete

Bhorti korchilo dumur

Shobe tokhon baccha perechilo shada holde beralta

Ami alap koraini?

Ami-i to tomake dekechilam

Janalar shiker upor humri khete baddho korechilam.

Kajolkakur babar gorutar nam lokkhi

Oi dumur gacher fak diye

Ek chilte jongla mather upor

Gorbhoboti lokkhi placenta

Aste aste bachurta bhumishto holo

Uthe daralo

Ma lokkhi chete khelo jibanu-bijanu

Shyampark-e chitke pore gele

Chore gelo hatu

School-er neel pant-tar chire jawa

Bhoy—

Ke chilo tomar shonge

Gonga joler niche pore thaka poli

Shei poli tule putul gorar bertho cheshta

Bathroom-er jong dhora flush-er upor

Gola payra — palok — dim

Shara dhupur shobar ghumer shujoge

Bathroom-er dorja bondho kore

Payra dhora

Ekdin lukiye khele nevicut

Mukhe kirokom gorom lagchilo

Mone hocchilo pure jabe

Tobuo charoni —-

Dhowar shonge prothom molakat

Nishiddho shad

Sadhupurir bhognostup

Je bhanga barir upor agacha

Naki agachar উপরেi barita

Bhojha jeto na

Keno je otar nam sadhupuri

Bhule gecho?

Kintu mone ache

Toktoke lal ekta phoring-er pechon pechon

Tara korechile chatujjeder shibmondir theke

Dhawa korte korte

Pouche gechile shei hana baritate

Ki oshombhob shundori shei phoring-tar

Pichu nite nite

Dhuke porechile shei poro barite

Makorshor jal—ondhokar

Ondhokarer moddhe hariye gechilo phoringta

Ba atke gechilo —- makorshar jale

Hotat ga chomchom

Eka mone hoyechilo tomar

Ami kintu chilam

Tomar pa pore gechilo kacha bishthay

Obak hoyechile —- talpukur-er pathortar upor

Kochle kochle pa dhute dhute

Bhebechile ke eto nischinte paykhana

Kore erokom bhuture barite

Mejmamur barir gondhoraj gachta

Tar pashei bete joba gachta

Tar pashei chinichampa

Ar tar pashe shei jora peyara gachta

Ja tomar shojjar motoi niribili chilo

Mogdale boshe helan diye

Kacha peyarar gaye hat bolate bolate

Chokh chole jeto electric pole

Banka khejur gach-take periye

Dhankhet ar dhankhet

Ar chobir moto ekta holdete bari

Kauke konodin jiggasha koroni

Ota ki?

Eker por ek lok periye jeto

Cycle-e, hete, chata mathay

Totokhone ice-cream-wala horn bajate shuru korto

Lal, shobuj, holde, shada omrito

Dosh-poyshay duto

Koyek muhurter jonno tumi ekbar hariye gechile

Ghure dariye khuje paoni kauke

Belunwala, omelet-bhaja, nagordola

Chyet kore uthechilo tomar buker bhetor

Kanna payni?

Tokhon tumi ekta parao cheno na

Prithibi to durer kotha.

Ajke jokhon boyoshko chokh-e

Gongar jole bhashte thaka

Boyar gaye shayla dekho

Kimba tairer dike odbhut nongra kichu

Jar nijossho choritro hariye

Ekhon nongra—- ojana hoye geche

Tari pashe shikor-gara

Capstan-ta dekho jong poreche ki na

Kimba bypass-er dhare dariye thaka

Kalo kacher sumo-r bhetor

Ghonishthota prottokkho koro

Mone rekho

Ami-i tomake prithibir shonge alap

Koriye diyechilam.

গানের মূল ভাব ও চরণ বিশ্লেষণ

শিলাজিতের এই সৃষ্টিটি জীবনের এক নিগূঢ় মনস্তাত্ত্বিক দলিল। গানের “আমি” চরিত্রটি কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নয়; এটি আসলে মানুষের নিজেরই “অবচেতন মন”, “অতীত শৈশব” বা “সময়”। এই ‘আমি’-ই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষটাকে তার জীবনের আদিম ও প্রথম অভিজ্ঞতাগুলোর কথা মনে করাচ্ছে:

  • পৃথিবীর আদিম রূপের সাথে পরিচয়: “সোনাদাদের বাড়ির বাইরের দিকে পোড়ো চানঘর…” থেকে শুরু করে বেড়ালের বাচ্চা দেওয়া কিংবা কাজলকাকুর গরু ‘লক্ষ্মী’-র বাছুর প্রসবের দৃশ্য—সবই জীবনের এক একটি নগ্ন ও আদিম বাস্তবতার রূপ। একটা শিশু যখন জানালার শিকে মুখ ঠেকিয়ে এই জগতকে দেখে, তখন সে প্রকৃতির এই জন্ম-মৃত্যু আর প্রজননের চক্রের সাথে পরিচিত হয়। এই চাক্ষুষ অভিজ্ঞতাগুলোই তাকে প্রথম ‘বসুন্ধরা’ বা পৃথিবীর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।

  • কৌতূহল ও নিষিদ্ধের স্বাদ: “একদিন lukiye khele nevicut…” — শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণের সময় মানুষের মধ্যে এক ধরণের নিষিদ্ধ কৌতূহল জাগে। গঙ্গার পলি দিয়ে পুতুল গড়ার ব্যর্থ চেষ্টা, দুপুরের ঘুমে লুকিয়ে পায়রা ধরা, কিংবা প্রথমবার লুকিয়ে ‘নেভিকাট’ সিগারেটের ধোঁয়ার স্বাদ নেওয়া—এগুলো জীবনের প্রথম অবাধ্যতা ও নিষিদ্ধ আনন্দের অভিজ্ঞতা। এই ‘নিষিদ্ধ স্বাদ’-এর মাধ্যমেই মানুষ ভালো মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখে।

  • ভয়, একাকীত্ব ও মায়ার রূপক: “টকটকে লাল একটা ফড়িং-এর পেছন পেছন…” — লাল ফড়িংটি এখানে মানুষের অবুঝ আকর্ষণ বা মোহের প্রতীক। ফড়িং ধরতে ধরতে হানা বাড়িতে ঢুকে পড়া এবং মাকড়সার জালে আটকে গিয়ে হঠাৎ একা হয়ে যাওয়ার অনুভূতি—মানুষের জীবনের প্রথম ভয়ের অভিজ্ঞতা। কিন্তু মন মনে করিয়ে দিচ্ছে, সেই একাকীত্বের মুহূর্তেও মানুষের নিজের ‘অস্তিত্ব’ বা ‘ছায়া’ তার সাথে ছিল। কাঁচা বিষ্ঠায় পা পড়া আর তা পুকুরে ধোয়ার যে অতি-বাস্তব ও কিছুটা কৌতুকপূর্ণ বর্ণনা, তা জীবনের নিখাদ মাটির গন্ধকে মনে করিয়ে দেয়।

  • শৈশবের বিস্ময় বনাম প্রাপ্তবয়স্কের যান্ত্রিকতা: মেজমামার বাড়ির নিরিবিলি পেয়ারা গাছ থেকে দূরের হলদেটে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকা কিংবা দশ পয়সায় দুটো আইসক্রিম খাওয়ার আনন্দ ছিল সরলতার প্রতীক। মেলায় হঠাৎ ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে গিয়ে বুকের ভেতর ‘ছ্যাৎ’ করে ওঠার মধ্য দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন, তখন শিশুটি একটা পাড়াও চিনত না, অথচ আজ সে পুরো পৃথিবী চিনে গেছে।

  • উপসংহার ও মোহভঙ্গ: “আজকে যখন বয়স্ক চোখে / গঙ্গার জলে ভাসতে থাকা বয়ার গায়ে শ্যাওলা দেখো…” — গানের শেষ অংশটি এক চরম বৈপরীত্য তৈরি করে। সেই ছোট ছেলেটি আজ বড় হয়েছে, তার চোখে এখন জগতটা আর বিস্ময়ের নয়, বরং যান্ত্রিক ও ক্লান্তিকর। গঙ্গার নোংরা জল, জং ধরা ক্যাপস্টান কিংবা ইএম বাইপাসের ধারে কালো কাঁচের সুমো গাড়ির ভেতরে যান্ত্রিক ঘনিষ্ঠতা—এসবই আধুনিক নাগরিক জীবনের রুক্ষ রূপ। জীবনের এই পরিণত বয়সে এসেও মানুষ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন তার ভেতরের সেই আদিম অবচেতনের কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে মনে করিয়ে দেয়—আজ তুমি যতই বড় বা বৈষয়িক হও না কেন, এই পৃথিবীর প্রতিটি রূপ, রস ও অভিজ্ঞতার প্রথম পাঠ কিন্তু আমিই তোমাকে দিয়েছিলাম।

উৎস (Sources)

এই নিবন্ধের লিরিক্স ও গভীর বিশ্লেষণ মূলত শিলাজিৎ মজুমদারের অত্যন্ত জনপ্রিয় অ্যালবাম এবং তাঁর নিজস্ব অল্টারনেটিভ ‘কথা-গান’ (Spoken Word Collection) প্রজেক্টের আদি অডিও ট্র্যাক থেকে সংগৃহীত। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন একক লাইভ কনসার্টেও তিনি গিটারের অ্যাকোস্টিক কর্ডের আবহে এই মনস্তাত্ত্বিক ট্র্যাকটি পরিবেশন করেছেন, যা বাংলা স্বাধীন গানের ইতিহাসে এক অনন্য সৃষ্টি হিসেবে স্বীকৃত।